জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাড়ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা। সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে বিভিন্ন খাতের প্রতিষ্ঠানের ওপর, যা কাটিয়ে উঠতে আগামী ২৫ বছরের মধ্যে বিভিন্ন খাতের প্রতিষ্ঠানে ২৫ ট্রিলিয়ন বা ২৫ লাখ কোটি ডলার তহবিল প্রয়োজন হবে। কিন্তু এ ধরনের সংকট মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেই কোম্পানিগুলোর। ইউরোপের ক্লাইমেট মনিটরিং সার্ভিস—কোপার্নিকাসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এ উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। খবর দ্য ন্যাশনাল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ বা ৩৫ শতাংশ কোম্পানি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।
প্রতিবেদন থেকে দেখা যাচ্ছে, পরিষেবা খাতের কোম্পানির মধ্যে ৫৮ শতাংশ জলবায়ু পরিবর্তনের আর্থিক প্রভাব মোকাবেলায় পরিকল্পনা নিয়েছে। এটি সর্বোচ্চ পরিমাণ। সর্বনিম্ন স্বাস্থ্যসেবা খাতে ২৫ শতাংশ কোম্পানি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এছাড়া দ্বিতীয় স্থানে থাকা ৫০ শতাংশ রিয়েল এস্টেট কোম্পানির পরিকল্পনা রয়েছে। ভোক্তাপণ্য, উপকরণ প্রস্তুতকারী ও শিল্পোৎপাদন খাতে পরিকল্পনা রয়েছে যথাক্রমে ৪২, ৩৯ ও ৩৮ শতাংশ কোম্পানির। এর পরই রয়েছে জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, আর্থিকসহ অন্যান্য খাত। অর্থাৎ পরিষেবা ও রিয়েল এস্টেট খাত ছাড়া বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অর্ধেকের বেশি কোম্পানি জলবায়ুর পরিবর্তনের আর্থিক প্রভাব মোকাবেলা নিয়ে সরব নয়।
এদিকে বাজার বিশ্লেষক সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিং বলছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে গত ফেব্রুয়ারিতে আর্কটিক সমুদ্রের বরফের রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। টানা তিন মাস ক্রমান্বয়ে রেকর্ড পরিমাণ কমছে সেখানকার বরফ। মেরু ও সমুদ্র অঞ্চলের বরফ পৃথিবীর তাপমাত্রার ভারসাম্য রক্ষা করে। প্রকৃতিকে শীতল থাকতে সহায়তা করে। ফলে এ ভারসাম্যহীনতা সরাসরি প্রভাব ফেলবে কৃষি ও শিল্প থেকে বিভিন্ন খাতের প্রতিষ্ঠানে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংয়ের বৈশ্বিক জলবায়ু অভিযোজন এবং স্থিতিস্থাপকতা বিশেষজ্ঞ পল মুন্ডে জানিয়েছেন, মাঝারি ধরনের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিস্থিতিতেও প্রধান কোম্পানিগুলোর আর্থিক ক্ষতি মেটাতে ট্রিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন হতে পারে। এ সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ২০৫০ সালের মধ্যে ২৫ লাখ কোটি ডলারে পৌঁছতে পারে। এর বিপরীতে তুলনামূলকভাবে খুব কমসংখ্যক কোম্পানিই এ অভিঘাত সামলানোর লক্ষ্যে জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা তৈরি করছে। এ প্রস্তুতির অভাব বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করবে বলে সতর্ক করেছে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিং।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা পূর্ববর্তী রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার পর ব্যবসায়িক প্রস্তুতি সংক্রান্ত সর্বশেষ এ তথ্য প্রকাশ হলো। গত মাসে ইতিহাসের তৃতীয় উষ্ণতম ফেব্রুয়ারি মাস দেখেছে বিশ্ব। যেখানে তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পযুগ সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৫৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। কোপার্নিকাসের বিজ্ঞানীরা বলছেন, সর্বশেষ ২০ মাসের মধ্যে ১৯ মাসের তাপমাত্রাই প্রাক-শিল্পযুগের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টেসের জলবায়ুবিষয়ক কৌশলগত প্রধান সামান্থা বার্গেস জানিয়েছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পরিণতিতে সমুদ্রের বরফের গলে যাওয়া এবং উভয় মেরুর বরফ রেকর্ড পরিমাণ কমে যাওয়ায় বিশ্বব্যাপী সমুদ্রের বরফের আস্তরণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে ঠেকেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সমুদ্রের বরফের গড় পরিমাণ প্রায় ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল, যা ১৯৯১-২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির গড় থেকে প্রায় ৮ শতাংশ কম।
চলতি বছরের শুরুতে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা-ডব্লিউএমও নিশ্চিত করেছে, ২০২৪ সাল ছিল সবচেয়ে উষ্ণতম বছর। অপ্রত্যাশিতভাবে জানুয়ারিতেও উষ্ণ আবহাওয়া অব্যাহত ছিল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, সমুদ্রের বাতাসের গতি পরিবর্তন বা লা নিনার প্রভাবও বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। তাই আগামী মাসগুলোয়ও আবহাওয়ার পরিবর্তন ও তাপপ্রবাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।